সংক্ষেপে: ‘হজ’ (حَجّ) অর্থ ‘দর্শনের ইচ্ছা করা, দৃঢ় সংকল্প করা’। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ— সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর জীবনে একবার ফরজ। হজে মাবরুর নিষ্পাপ ফেরা ও জান্নাতের পুরস্কার (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩)।
ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির (স্তম্ভের) মধ্যে সর্বশেষ এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ‘হজ’। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নর-নারীর ওপর জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা ফরজ (বাধ্যতামূলক)।
পবিত্র মক্কা নগরীতে গিয়ে আল্লাহর ঘরে হাজিরা দেওয়া এবং নবীজির (সা.) রওজা মোবারক জিয়ারত করা পৃথিবীর প্রতিটি মুসলিমের সবচেয়ে বড় লালিত স্বপ্ন। কিন্তু অনেকেই হজের আভিধানিক অর্থ এবং ইসলামি শরিয়তে এর প্রকৃত সংজ্ঞা সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ‘হজ’ শব্দের অর্থ, ইসলামি পরিভাষায় হজ কাকে বলে এবং কোরআন-হাদিসের আলোকে এর ফজিলত সম্পর্কে জানবো।
এক নজরে ‘হজ’
| বিবরণ | তথ্য |
|---|---|
| শব্দ | হজ (حَجّ) |
| ভাষা | আরবি |
| আভিধানিক অর্থ | ইচ্ছা, সংকল্প, দর্শনের ইচ্ছা |
| হজের মাস | জিলহজ |
| মূল সময় | ৮-১২ জিলহজ (৫ দিন) |
| ইসলামের স্তম্ভে অবস্থান | ৫ম |
| রেফারেন্স | সূরা আলে ইমরান: ৯৭ |
হজ শব্দের অর্থ কি? (আভিধানিক বিশ্লেষণ)
‘হজ’ (حَجّ) একটি খাঁটি আরবি শব্দ। আরবি ব্যাকরণ ও আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হজ শব্দের প্রধান কয়েকটি অর্থ হলো:
-
ইচ্ছা করা বা এরাদা করা (To intend)।
-
দৃঢ় সংকল্প করা (To resolve)।
-
কোনো মহান, সম্মানিত বা পবিত্র স্থান দর্শনের ইচ্ছা করা।
যেহেতু পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ও পবিত্র স্থান কাবা ঘর জিয়ারত করার জন্য অত্যন্ত দৃঢ় সংকল্প নিয়ে মানুষ মক্কার দিকে ছুটে যায়, তাই এই মহান ইবাদতটির নামকরণ করা হয়েছে ‘হজ’।
ইসলামি পরিভাষায় হজ কাকে বলে?
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় হজের একটি সুনির্দিষ্ট এবং ব্যাপক অর্থ রয়েছে।
“মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, জিলহজ মাসের নির্ধারিত দিনগুলোতে (৮ থেকে ১২ জিলহজ), নির্দিষ্ট নিয়মে (ইহরাম, তাওয়াফ, সায়ি, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান ইত্যাদি) পবিত্র কাবা ঘর এবং এর আশপাশের নির্ধারিত স্থানগুলো যিয়ারত করার দৃঢ় সংকল্প করাকেই ‘হজ’ বলা হয়।”
অর্থাৎ, শুধু মক্কায় গেলেই হজ হবে না, বরং ইহরাম বাঁধা থেকে শুরু করে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, মুজদালিফায় রাত যাপন, মিনায় পাথর নিক্ষেপ এবং কাবা ঘর তাওয়াফ— এই পুরো প্রক্রিয়ার সমন্বিত রূপই হলো হজ।
হজ কার ওপর ফরজ?
নামাজ বা রোজার মতো হজ সবার ওপর ফরজ নয়। ইসলাম অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি ধর্ম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা হজের শর্ত হিসেবে ‘সামর্থ্য’ থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
“আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে (কাবা ঘর পর্যন্ত) যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার ওপর ফরজ।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
হজ ফরজ হওয়ার প্রধান শর্তগুলো হলো:
- মুসলিম হতে হবে।
- স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) হতে হবে।
- সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে।
- হজে যাওয়া-আসা এবং সেখানে অবস্থানের যাবতীয় খরচ বহনের আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে।
- হজ থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত তার পরিবারের ভরণপোষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে।
- যাতায়াতের পথ নিরাপদ হতে হবে।
- মহিলাদের ক্ষেত্রে হজে যাওয়ার জন্য স্বামী বা মাহরাম (যার সাথে বিবাহ হারাম) কোনো পুরুষ সঙ্গী থাকতে হবে।
হজের ৫ দিনের কার্যক্রম
| দিন | তারিখ | প্রধান কাজ |
|---|---|---|
| ১ | ৮ জিলহজ (তারবিয়ার দিন) | মিনায় গমন |
| ২ | ৯ জিলহজ (আরাফার দিন) | আরাফাতে অবস্থান, মুজদালিফায় রাত |
| ৩ | ১০ জিলহজ (কোরবানির দিন) | পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি, তাওয়াফ |
| ৪ | ১১ জিলহজ | মিনায় ৩ পাথর নিক্ষেপ |
| ৫ | ১২ জিলহজ | মিনায় বাকি পাথর, বিদায় তাওয়াফ |
হজের ফজিলত ও গুরুত্ব (হাদিসের আলোকে)
হজ হলো এমন এক ইবাদত, যা মানুষের জীবনের সমস্ত গুনাহ ধুয়ে-মুছে তাকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ করে দেয়।
১. জান্নাতের গ্যারান্টি:
সহিহ বুখারি (হাদিস নং- ১৭৭৩) ও সহিহ মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“হজ্জে মাবরুর (অর্থাৎ যে হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে) এর প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।”
২. নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসা:
সহিহ বুখারির অন্য একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করল এবং হজের সময় কোনো অশ্লীল কথা বা পাপ কাজে লিপ্ত হলো না, সে হজ থেকে এমনভাবে (নিষ্পাপ হয়ে) ফিরে আসবে, যেন আজই তার মা তাকে জন্ম দিয়েছে।” (সহিহ বুখারি: ১৫২১)
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: হজ ও ওমরাহর পার্থক্য কী?
উত্তর: হজ ফরজ, নির্দিষ্ট দিনে পালন হয়। ওমরাহ সুন্নাত, বছরের যেকোনো সময় পালন করা যায়— এবং তাতে আরাফাত-মিনার কাজ নেই।
প্রশ্ন ২: হজ কতবার ফরজ?
উত্তর: জীবনে মাত্র একবার। বাকি সবগুলো নফল।
প্রশ্ন ৩: মহিলা মাহরাম ছাড়া হজে যেতে পারবেন?
উত্তর: হানাফি মতে না; শাফেয়ি মতে একদল বিশ্বস্ত নারীদের সাথে যেতে পারেন।
প্রশ্ন ৪: হজে গিয়ে মারা গেলে কি সরাসরি জান্নাত?
উত্তর: হাদিসে এসেছে— ইহরাম অবস্থায় মারা গেলে কিয়ামতে তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবেন। (সহিহ বুখারি: ১২৬৫)
প্রশ্ন ৫: হজে খরচ কত?
উত্তর: দেশ ও প্যাকেজভেদে ভিন্ন; বাংলাদেশে ৪-৭ লাখ টাকা (সরকারি-বেসরকারি)।
সম্পর্কিত পোস্ট
শেষ কথা
হজ শুধু একটি ইবাদত নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর বিশ্বজনীন ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাদা-কালো, ধনী-গরিব সব ভেদাভেদ ভুলে একই পোশাকে (ইহরামে) একই রবের দরবারে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলে যে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়, তা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনে অন্তত একবার পবিত্র হজ পালন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
সমীক্ষা ও রেফারেন্স: সূরা আলে ইমরান: ৯৭, সহিহ বুখারি: ১৫২১, ১৭৭৩, সহিহ মুসলিম।
সর্বশেষ যাচাই: ১৬ জুলাই, ২০২৬।
