দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মধ্যে যোহর হলো দিনের দ্বিতীয় নামাজ। দুপুরে সূর্য ঠিক মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার পর যোহরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয়। নতুন যারা নামাজ শিখছেন বা যারা নিজেদের নামাজের নিয়মগুলো আরও ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে চান, তাদের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন আসে—যোহরের নামাজ কয় রাকাত?
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা যোহরের নামাজের মোট রাকাত সংখ্যা, সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ও নফলের বিবরণ এবং যোহরের নামাজ সংক্রান্ত কিছু জরুরি মাসআলা খুব সহজভাবে জানবো।
সংক্ষেপে: যোহরের নামাজ মোট ১২ রাকাত — ৪ রাকাত সুন্নত (ফরজের আগে) + ৪ রাকাত ফরজ + ২ রাকাত সুন্নত (ফরজের পর) + ২ রাকাত নফল। ফরজ এবং সব সুন্নাতে মুয়াক্কাদা মিলিয়ে ন্যূনতম ১০ রাকাত অবশ্যই পড়া উচিত।
যোহরের নামাজ মোট কয় রাকাত?
যোহরের নামাজ সাধারণত মোট ১২ রাকাত পড়া হয়। এর মধ্যে ফরজ, সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এবং নফল নামাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ১২ রাকাত নামাজ একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে আদায় করতে হয়।
নিচে ছকের মাধ্যমে যোহরের নামাজের রাকাতগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
| নামাজের ধরন | রাকাত সংখ্যা | পড়ার সময় | হুকুম / গুরুত্ব |
|---|---|---|---|
| প্রথম সুন্নত | ৪ রাকাত | ফরজের আগে | সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ) |
| ফরজ নামাজ | ৪ রাকাত | সুন্নতের পর | ফরজ (অবশ্যই পড়তে হবে) |
| শেষ সুন্নত | ২ রাকাত | ফরজের পর | সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (গুরুত্বপূর্ণ) |
| নফল নামাজ | ২ রাকাত | শেষ সুন্নতের পর | নফল (পড়া উত্তম, না পড়লে গুনাহ নেই) |
| সর্বমোট | ১২ রাকাত |
রাকাতগুলোর বিস্তারিত বিবরণ ও ফজিলত
যোহরের নামাজের প্রতিটি অংশের আলাদা গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। হাদিসের আলোকে চলুন সেগুলো জেনে নিই:
১. ফরজের আগের ৪ রাকাত সুন্নত
যোহরের ৪ রাকাত ফরজ নামাজের আগে যে ৪ রাকাত সুন্নত পড়া হয়, তা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’। অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই নামাজ নিয়মিত পড়তেন এবং তা ছাড়তেন না।
- হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ বুখারি (হাদিস নং- ১১৮২)-তে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, “নবী কারিম (সা.) যোহরের ফরজের আগের চার রাকাত এবং ফজরের ফরজের আগের দুই রাকাত (সুন্নত) কখনো ছাড়তেন না।”
২. ৪ রাকাত ফরজ নামাজ
এটি যোহরের মূল নামাজ এবং এটি আদায় করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর ফরজ। পুরুষদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে এই ৪ রাকাত ফরজ আদায় করা উত্তম। যোহরের ফরজ নামাজে ইমাম সাহেব কিরাত (সূরা) নীরবে বা মনে মনে তিলাওয়াত করেন।
৩. ফরজের পরের ২ রাকাত সুন্নত
যোহরের ফরজ আদায় করার পর ২ রাকাত সুন্নত নামাজ পড়তে হয়। এটিও ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’।
- হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ বুখারি (হাদিস নং- ১১৬৫)-তে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে যোহরের আগে দুই রাকাত (অন্য বর্ণনায় চার রাকাত) এবং যোহরের পরে দুই রাকাত নামাজ পড়েছি।”
৪. ২ রাকাত নফল
শেষ ২ রাকাত সুন্নতের পর আরও ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ার প্রচলন রয়েছে। নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর আরও কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং হাশরের ময়দানে ফরজের কোনো ঘাটতি থাকলে নফল দিয়ে তা পূরণ করা হবে। তবে সময়ের অভাব থাকলে বা কোনো ব্যস্ততা থাকলে এটি না পড়লেও কোনো গুনাহ হবে না।
যোহরের ৪ রাকাত সুন্নত পড়ার বিশেষ ফজিলত
যোহরের আগের ৪ রাকাত সুন্নত নামাজের একটি বিশেষ পুরস্কার রয়েছে যা অন্য কোনো সুন্নতে নেই:
জামে তিরমিজি (হাদিস নং- ৪২৭)-তে উম্মে হাবিবা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন — “যে ব্যক্তি নিয়মিত যোহরের ফরজের আগে ও পরে ৪ + ২ রাকাত সুন্নাত আদায় করে, আল্লাহ তার শরীরকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেন।”
এই ফজিলত অর্জনের জন্য শর্ত হলো — নিয়মিত পড়া।
যোহরের নামাজ সংক্রান্ত কিছু জরুরি মাসআলা
যোহরের নামাজ পড়তে গিয়ে অনেক সময় আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। আমাদের দেশের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া ও হানাফি মাজহাবের আলোকে কিছু সাধারণ মাসআলা নিচে দেওয়া হলো:
- ফরজের আগের সুন্নত ছুটে গেলে কী করবেন? কোনো কারণে যদি আপনি মসজিদে গিয়ে দেখেন যোহরের ফরজ নামাজের জামাত শুরু হয়ে গেছে, তবে সুন্নত না পড়ে সরাসরি জামাতে শরিক হয়ে যাবেন। এরপর ফরজ নামাজ ও পরের ২ রাকাত সুন্নত আদায় করার পর, ছুটে যাওয়া প্রথম ৪ রাকাত সুন্নত পড়ে নেবেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং- ৪২৬)।
- সুন্নত পড়া অবস্থায় জামাত শুরু হলে কী করবেন? আপনি যদি যোহরের প্রথম ৪ রাকাত সুন্নত শুরু করেন এবং এরই মধ্যে ফরজ নামাজের ইকামত শুরু হয়ে যায়, তবে আপনি যদি প্রথম বা দ্বিতীয় রাকাতে থাকেন, তবে ২ রাকাত পূর্ণ করে সালাম ফিরিয়ে জামাতে যুক্ত হবেন। আর যদি তৃতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে যান, তবে দ্রুত ৪ রাকাত পূর্ণ করে তারপর জামাতে শরিক হবেন।
- যোহরের নামাজের ওয়াক্ত: দুপুরে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার পর (যাওয়াল) যোহরের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং আসরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তা বিদ্যমান থাকে। তবে বিনা কারণে ওয়াক্তের শেষ সময় পর্যন্ত যোহরের নামাজ দেরি করা মাকরুহ।
সাধারণ ভুল যেগুলো এড়িয়ে চলা দরকার
- শুধু ফরজ পড়ে চলে যাওয়া: যোহরের সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (৪+২ রাকাত) না পড়া হাদিস অনুযায়ী মাকরুহ। জাহান্নামের আগুন হারাম হওয়ার ফজিলত হারানো হয়।
- অলস দুপুরে কাযা করা: কর্মজীবনে অনেকে যোহর অলসতার কারণে বিলম্বিত করেন। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার পর দ্রুত পড়া উত্তম।
- যোহরের সাথে জুমা: জুমার দিন জুমা পড়া হলে যোহর পড়া লাগে না। ভুল ধারণায় দুটো পড়লে যোহর নফল হয়ে যায়।
- তৃতীয়-চতুর্থ রাকাতে সূরা মেলানো: ফরজের ৩য়-৪র্থ রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়তে হয়, অন্য সূরা মেলানো ভুল।
- নীরব কিরাত সরাসরি বলা: যোহরের ফরজে সব রাকাতে কিরাত নীরব — শব্দ করে পড়া ভুল।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: যোহরের নামাজ মিনিমাম কত রাকাত?
উত্তর: অন্তত ৮ রাকাত — ৪ ফরজ + ৪ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (৪+২ = ৬ সুন্নত, তবে অন্তত ৪ রাকাত সুন্নত পড়া চাই)। বেশি ভালো হয় ১০ রাকাত (৪ সুন্নত + ৪ ফরজ + ২ সুন্নত)। ২ রাকাত নফল একদম ঐচ্ছিক।
প্রশ্ন ২: জুমার দিনে যোহর পড়তে হবে?
উত্তর: না। জুমার নামাজ যোহরের বদলে পড়া হয়। জুমা যিনি ধরতে পারেননি (যেমন মহিলা বা মুসাফির) তিনি যোহর পড়বেন। জুমা পড়ে যোহর পড়া বিদআত।
প্রশ্ন ৩: যোহরের ফরজ সমাপ্ত হওয়ার পর কি সাথে সাথে সুন্নত পড়া যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ। ফরজের পর সালাম ফিরিয়ে দোয়া করে তারপর ২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পড়া নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ। ফরজ ও এই সুন্নতের মাঝে বিরতি না দেওয়াই উত্তম।
প্রশ্ন ৪: যোহরের নামাজের ওয়াক্তে সূরা কতটুকু বড় পড়া যায়?
উত্তর: যোহরে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ (সূরা হুজুরাত থেকে সূরা বুরুজ পর্যন্ত) থেকে তিলাওয়াত সুন্নাত। এশা/ফজরের চেয়ে একটু ছোট সূরা মেলানো যায়।
প্রশ্ন ৫: গরমকালে যোহর দেরি করা যায় কি?
উত্তর: হ্যাঁ, চরম গরমে যোহর কিছুটা বিলম্ব করা সুন্নাহ। সহিহ বুখারি (৫৩৩)-তে এসেছে, “গরম বেড়ে গেলে যোহর একটু ঠান্ডা করে (দেরিতে) পড়ো।” তবে আসরের ওয়াক্ত শুরুর আগেই পড়তে হবে।
সম্পর্কিত আরও পোস্ট
- ফজরের নামাজ কয় রাকাত ও পড়ার নিয়ম
- আসরের নামাজ কয় রাকাত ও নিয়ম
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিয়ম ও পঠিত সূরা
- জুমার প্রথম ও দ্বিতীয় খুতবা বাংলা উচ্চারণ
শেষ কথা
যোহরের নামাজ আমাদের দিনের মধ্যভাগের একটি প্রশান্তি। কাজের ফাঁকে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ আমাদের কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
সমীক্ষা ও রেফারেন্স: এই পোস্টটি সহিহ বুখারি (হাদিস ৫৩৩, ১১৬৫, ১১৮২), জামে তিরমিজি (৪২৬, ৪২৭) ও হানাফি ফিকহের কিতাব অনুসারে যাচাই করা হয়েছে।
সর্বশেষ যাচাই: ১৪ জুলাই, ২০২৬
