আল্লাহর ভয় সম্পর্কে ঘটনা: তাকওয়া ও সততার ২ টি ঈমানদীপ্ত গল্প

ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহর ভয়কে বলা হয় ‘তাকওয়া’ (Taqwa)। তাকওয়া মানে শুধু আল্লাহকে ভয় পাওয়াই নয়, বরং কেউ দেখুক বা না দেখুক, সব অবস্থায় আল্লাহ আমাকে দেখছেন—এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করে সব ধরনের পাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার নামই হলো তাকওয়া।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু বা মুত্তাকি।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)।

ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম এবং সাধারণ মুমিনদের জীবনে আল্লাহর ভয়ের অসংখ্য লোমহর্ষক ও ঈমান জাগানিয়া ঘটনা রয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া সম্পর্কে অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক দুটি সত্য ঘটনা জানবো, যা আমাদের ঈমানকে আরও মজবুত করবে।

আপনার ওয়েবসাইটের লেআউট ঠিক রাখার জন্য এই আর্টিকেলেও কোনো ছক ব্যবহার করা হয়নি, ঘটনাগুলো অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরা হলো:

ঘটনা ১: হজরত উমর (রা.) ও দুধ বিক্রেতা মেয়ের তাকওয়া

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর শাসনকাল। তিনি রাতের বেলা সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য মদিনার অলিতে-গলিতে ছদ্মবেশে টহল দিতেন।

এক রাতের ঘটনা। খলিফা উমর (রা.) টহল দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে একটি কুঁড়েঘরের দেয়ালের পাশে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে মা ও মেয়ের কথোপকথন তাঁর কানে ভেসে এল।

  • মা বলছে: “মা, সকাল হয়ে যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি দুধের সাথে একটু পানি মিশিয়ে দাও, তাহলে বেশি দামে বিক্রি করা যাবে।”
  • মেয়ে উত্তর দিল: “মা, আপনি কি জানেন না খলিফা উমর (রা.) দুধে পানি মেশাতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন?”
  • মা ধমক দিয়ে বলল: “আরে বোকা মেয়ে! এত রাতে খলিফা উমর কি আর দেখতে আসছে যে তুমি দুধে পানি মেশাচ্ছ? তুমি পানি মিশিয়ে দাও।”
  • মেয়ের ঈমানদীপ্ত জবাব: “মা! খলিফা উমর হয়তো এখন দেখছেন না, কিন্তু খলিফার রব (মহান আল্লাহ) তো সব দেখছেন! আমি খলিফার চোখের আড়ালে এই অন্যায় করতে পারি, কিন্তু আল্লাহর চোখের আড়ালে তো যেতে পারব না।”

দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে খলিফা উমর (রা.) দরিদ্র এই মেয়ের মুখে এমন তাকওয়া ও আল্লাহর ভয়ের কথা শুনে কেঁদে ফেললেন। তিনি ওই বাড়িটি চিনে রাখলেন। পরের দিন সকালে তিনি ওই দরিদ্র অথচ মুত্তাকি মেয়েটির সততায় মুগ্ধ হয়ে নিজের ছেলে আসিম (রা.)-এর সাথে অত্যন্ত সম্মানের সাথে তার বিয়ে দেন। এই পুণ্যবতী নারীর বংশেই পরবর্তীতে জন্ম নিয়েছিলেন ইসলামের আরেক শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ খলিফা হজরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.)।

ঘটনা ২: রাখাল বালক ও হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত সাহাবী হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) একবার কিছু সঙ্গীকে নিয়ে মক্কার দিকে সফরে বের হলেন। পথে একটি জায়গায় তাঁরা বিশ্রামের জন্য থামলেন।

এমন সময় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এক রাখাল বালক ছাগলের পাল নিয়ে সেখানে এল। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাখালকে পরীক্ষা করার জন্য কাছে ডেকে বললেন,

  • ইবনে উমর (রা.): “হে রাখাল! তোমার পাল থেকে একটি ছাগল আমাদের কাছে বিক্রি করো। আমরা এর গোশত রান্না করে খাব এবং তোমাকেও এর একটি অংশ দেব। সাথে ছাগলের দামও দেব।”
  • রাখাল বালক বলল: “আমি তো এই ছাগলগুলোর মালিক নই। আমি একজন সামান্য দাস এবং রাখাল মাত্র। আমার মালিক আমাকে এগুলো চড়াতে পাঠিয়েছেন। আমি বিক্রি করতে পারব না।”
  • ইবনে উমর (রা.) তাকে পরীক্ষা করার জন্য আবার বললেন: “আরে, তুমি একটি ছাগল আমাদের দিয়ে দাও। তোমার মালিককে গিয়ে বলবে যে একটি ছাগলকে নেকড়ে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। সে তো আর এখানে দেখতে আসছে না।”

এই কথা শোনার সাথে সাথে রাখাল বালকটি চমকে উঠল। সে আকাশের দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলে উঠল—

  • রাখালের জবাব: “ফাইনাল্লাহ?” (فَأَيْنَ الله؟) অর্থাৎ, মালিক না হয় দেখছে না, কিন্তু “তাহলে আল্লাহ কোথায়?” আল্লাহ কি দেখছেন না?

এক দরিদ্র দাসের মুখে আল্লাহর ভয়ের এই চূড়ান্ত প্রকাশ দেখে ইবনে উমর (রা.) অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। তিনি বারবার রাখালের সেই কথাটি আওড়াতে লাগলেন— “ফাইনাল্লাহ? আল্লাহ কোথায়?”

সফর শেষে মদিনায় ফিরে তিনি ওই রাখালের মালিককে খুঁজে বের করলেন। নিজের অর্থে ওই ছাগলের পালসহ রাখাল বালকটিকে কিনে নিলেন। এরপর ছাগলগুলো ওই বালককে উপহার দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে স্বাধীন বা মুক্ত করে দিলেন।

ঘটনা দুটি থেকে আমাদের শিক্ষা

এই অসাধারণ ঘটনাগুলো থেকে আমাদের বর্তমান জীবনের জন্য অনেক বড় শিক্ষা রয়েছে:

  • আল্লাহর সার্বক্ষণিক নজরদারি: আমরা অফিসে, ঘরে বা গোপনে যেখানেই থাকি না কেন, বস বা সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলেও আল্লাহর সিসিটিভি (ফেরেশতা ও আল্লাহর দৃষ্টি) সবসময় চালু আছে।
  • সততার পুরস্কার: দুধ বিক্রেতা মেয়েটি অভাবী হয়েও অসৎ পথ বেছে নেয়নি বলে আল্লাহ তাকে খলিফার পুত্রবধূ হওয়ার সম্মান দিয়েছেন। আর রাখাল বালকটি দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। দুনিয়াতে হয়তো সব সৎকাজের তাৎক্ষণিক পুরস্কার পাওয়া যায় না, কিন্তু আখিরাতে মুত্তাকিদের জন্য আল্লাহ বিশাল পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।
  • চরিত্র গঠন: তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় মানুষের চরিত্রকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে গঠন করে, যা আইন বা পুলিশ দিয়ে কখনো সম্ভব নয়।

শেষ কথা: অন্ধকার রুমে একা বসে যখন চোখের সামনে পাপে জড়ানোর সুযোগ থাকে, তখন শুধু “আল্লাহ আমাকে দেখছেন”—এই ভয়ে পাপ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার নামই প্রকৃত তাকওয়া। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার অন্তরে সাহাবায়ে কেরাম এবং ওই রাখাল বালকের মতো অগাধ তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে দিন। আমিন।

Similar Posts

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।