জুমার দিনের শ্রেষ্ঠ দরুদ শরীফ, পড়ার নিয়ম ও অসাধারণ ফজিলত

জুমার দিন বা শুক্রবার হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। এই দিনটিকে হাদিসে ‘সাপ্তাহিক ঈদের দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জুমার দিনের অসংখ্য নেক আমলের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ আমল হলো প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং উম্মতকে জুমার দিন ও জুমার রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) বেশি বেশি দরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জুমার দিনে পড়ার জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কয়েকটি দরুদ শরীফ, পড়ার নিয়ম এবং এর অসাধারণ ফজিলত সম্পর্কে জানবো।

সংক্ষেপে: জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়া নবীজি (সা.)-এর সরাসরি নির্দেশ (আবু দাউদ ১০৪৭)। প্রতিটি দরুদে ১০টি রহমত + ১০টি গুনাহ মাফ + ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি (মুসলিম/নাসাঈ)। শ্রেষ্ঠ দরুদ = দরুদে ইবরাহিম।

জুমার দিনে দরুদ পড়ার বিশেষ গুরুত্ব (হাদিসের আলোকে)

জুমার দিন দরুদ পড়ার গুরুত্ব বোঝাতে সুনানে আবু দাউদের একটি বিখ্যাত হাদিসে হজরত আওস ইবনে আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন।… কাজেই এই দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কারণ, তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।”

সাহাবীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার ইন্তেকালের পর যখন আপনার দেহ মোবারক মাটিতে মিশে যাবে, তখন কীভাবে আমাদের দরুদ আপনার কাছে পেশ করা হবে?” নবীজি (সা.) উত্তরে বললেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নবীদের শরীর মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)।

জুমার দিনে পড়ার জন্য শ্রেষ্ঠ ৩টি দরুদ শরীফ

জুমার দিন যেকোনো দরুদ শরীফ পড়লেই সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে হাদিসের আলোকে নিচে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ ৩টি দরুদ দেওয়া হলো:

১. দরুদে ইবরাহিম (সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দরুদ)

নামাজে আমরা যে দরুদটি পড়ি, সেটিই হলো ‘দরুদে ইবরাহিম’। সব দরুদের মধ্যে এটি হলো শ্রেষ্ঠ দরুদ বা ‘সাইয়্যিদুদ দরুদ’। জুমার দিন সময় করে এই দরুদটি বেশি বেশি পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

  • আরবি: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
  • বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহীমা, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহীমা, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
  • অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমনটি আপনি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমনটি আপনি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত।”

২. আসরের পরের বিশেষ দরুদ (৮০ বছরের গুনাহ মাফের দরুদ)

জুমার দিন আসরের নামাজের পর নিজ স্থান থেকে ওঠার আগে এই ছোট দরুদটি ৮০ বার পাঠ করলে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয় এবং ৮০ বছরের ইবাদতের সওয়াব আমলনামায় লেখা হয়। (এই বর্ণনা বিভিন্ন ইসলামিক কিতাবে বর্ণিত)।

  • আরবি: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ وَعَلَى آلِهِ وَسَلِّم تَسْلِيمًا
  • বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আ’লা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আ’লা আ-লিহী ওয়া সাল্লিম তাসলীমা।
  • অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি উম্মি নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর রহমত ও অগণিত শান্তি বর্ষণ করুন।”

৩. সবচেয়ে ছোট দরুদ (হাঁটতে চলতে পড়ার জন্য)

জুমার দিন কাজের ফাঁকে, হাঁটতে চলতে বা অবসরে আপনি চাইলে সবচেয়ে ছোট দরুদটি অসংখ্যবার পড়তে পারেন। এর ফজিলতও অপরিসীম।

  • আরবি: صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
  • বাংলা উচ্চারণ: সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
  • অর্থ: “আল্লাহ তাঁর (নবীর) ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।”

তিন দরুদের তুলনা — কোনটি কখন?

দরুদ দৈর্ঘ্য উত্তম সময় কেন?
দরুদে ইবরাহিম দীর্ঘ নামাজের বৈঠকে, ধ্যানের সময় শ্রেষ্ঠ দরুদ, নবীজির শেখানো
৮০ বার দরুদ মাঝারি জুমার দিন আসরের পর বিশেষ ফজিলতের বর্ণনা
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংক্ষিপ্ত সব সময়, চলতে-ফিরতে সহজে বেশি সংখ্যায় পড়া যায়

জুমার দিনে দরুদ পড়ার ৫টি অসাধারণ ফজিলত

  1. ১০টি রহমত নাজিল হয়: রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন।” (সহিহ মুসলিম ৪০৮)।

  2. ১০টি গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি: শুধু রহমতই নয়, একবার দরুদ পড়লে বান্দার ১০টি গুনাহ মাফ করা হয় এবং তার ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। (সুনানে নাসাঈ ১২৯৭)।

  3. কিয়ামতের দিন নবীজির নৈকট্য: রাসূল (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে বেশি নিকটে থাকবে, যে দুনিয়াতে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে।” (জামে তিরমিজি ৪৮৪)।

  4. ফেরেশতাদের মাধ্যমে সালাম পৌঁছানো: জুমার দিন স্পেশাল ফেরেশতারা মানুষের পড়া দরুদ সরাসরি নবীজির (সা.) রওজা মোবারকে নিয়ে যান এবং বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অমুক উম্মত আপনার ওপর এই সালাম পাঠিয়েছে।”

  5. টেনশন ও পেরেশানি দূর হয়: যে ব্যক্তি বেশি বেশি দরুদ পড়ে, আল্লাহ তায়ালা তার দুনিয়া ও আখিরাতের সব চিন্তা ও পেরেশানি দূর করে দেন এবং তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেন।

জুমার দিনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল

দরুদের পাশাপাশি জুমার দিনে যেসব আমল বিশেষ ফজিলতপূর্ণ:

  • সূরা কাহাফ তিলাওয়াত: ফজিলত — এক জুমা থেকে অন্য জুমা পর্যন্ত নূর (সহিহ হাকেম ২/৩৯৯)
  • সাধারণ গোসল ও পরিষ্কার পোশাক: জুমার আজানের আগে
  • প্রথম কাতারে জামাত: শীঘ্র মসজিদে যাওয়া
  • দোয়া কবুলের ঘড়ি (সা’আতুল ইজাবা): জুমার দিনের একটি বিশেষ মুহূর্তে দোয়া কবুল
  • ফজরে সূরা সাজদাহ + সূরা ইনসান পড়া (ইমামের জন্য): সহিহ বুখারি ৮৯১

সাধারণ ভুল যেগুলো এড়িয়ে চলা দরকার

  • নামের সঙ্গে শুধু “সা.” বা “SAW” লেখা: পূর্ণ “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” পড়া উত্তম।
  • শুক্রবার শুধু বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকা: জুমার দিন বিশেষ ইবাদতের দিন — অন্তত ১ ঘণ্টা রাখুন।
  • আসরের পর দরুদ ভুলে যাওয়া: জুমার দিনের আসর ও মাগরিবের মাঝের সময়টা সা’আতুল ইজাবা হতে পারে।
  • বিদআতি দরুদ পড়া: কেবল হাদিস-প্রমাণিত দরুদ পড়ুন। নাচের সাথে বা তালে তালে দরুদ পড়া নবীজির (সা.) সুন্নাহ নয়।
  • শুধু জুমার দিন দরুদ পড়া: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ১০ বার দরুদ পড়া সুন্নাহ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: প্রতিদিন কতবার দরুদ পড়া উচিত?
উত্তর: হাদিসে সকাল ১০ বার + সন্ধ্যা ১০ বার = ২০ বার সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত (কিছু বর্ণনায়)। জুমার দিন ১০০ বা ৩০০ বার লক্ষ্য রাখুন।

প্রশ্ন ২: দরুদ পড়ার সময় হাত তুলতে হবে?
উত্তর: না, হাত তোলার প্রয়োজন নেই। মনে মনে বা মৃদু স্বরে পড়া যায়। বসে/দাঁড়িয়ে/হাঁটতে যেভাবে সুবিধা।

প্রশ্ন ৩: বাংলায় দরুদ পড়া যাবে?
উত্তর: আরবিতে পড়াই উত্তম। বাংলা অর্থ বোঝার জন্য পড়া যায়, কিন্তু আসল সওয়াব আরবি উচ্চারণে।

প্রশ্ন ৪: মহিলাদের জন্য কি ভিন্ন দরুদ?
উত্তর: না, একই দরুদ। ঋতুস্রাব/নিফাসের সময়েও দরুদ পড়া জায়েজ (কোরআন-তিলাওয়াত নিষিদ্ধ, কিন্তু দরুদ পড়া যায়)।

প্রশ্ন ৫: বৃহস্পতিবার রাত থেকে দরুদ পড়া শুরু করব?
উত্তর: হ্যাঁ। জুমার রাত = বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে জুমার দিনের মাগরিব পর্যন্ত। এই ২৪ ঘণ্টায় বেশি বেশি দরুদ।

সম্পর্কিত আরও পোস্ট

শেষ কথা

দরুদ শরীফ হলো এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহ তায়ালা সরাসরি কবুল করে নেন। জুমার দিনটি আমাদের জন্য একটি সাপ্তাহিক বোনাস। আসুন, আমরা প্রতি জুমাবার অন্তত ১০০ বার বা ৩০০ বার যেকোনো একটি দরুদ শরীফ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রিয়নবী (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ার তৌফিক দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফায়াত নসিব করুন। আমিন।


সমীক্ষা ও রেফারেন্স: এই পোস্টটি সুনানে আবু দাউদ (হাদিস ১০৪৭), সহিহ মুসলিম (৪০৮), সুনানে নাসাঈ (১২৯৭), জামে তিরমিজি (৪৮৪), সহিহ হাকেম (২/৩৯৯) ও সহিহ বুখারি (৮৯১) এর রেফারেন্স অনুসারে যাচাই করা হয়েছে।
সর্বশেষ যাচাই: ১৪ জুলাই, ২০২৬

Similar Posts

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।